Home •আন্তর্জাতিক নির্মূলের মুখে রোহিঙ্গা মুসলিমঃ পরিত্রাণ কীরূপে?
নির্মূলের মুখে রোহিঙ্গা মুসলিমঃ পরিত্রাণ কীরূপে? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 23 September 2017 15:53

মুসলিম নির্মূল-প্রকল্প কেন আরাকানে?

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আরাকান (বর্তমান নাম রাখাইন) থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূলের কাজটি এখন চুড়ান্ত পর্যায়ে। নির্মূল প্রক্রিয়ার শুরু আজ নয়, বহু পূর্ব থেকে। বার বার তাতে নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে। সেটি যেমন ১৯৭৮, ১৯৮৪ ও ২০১২ সালে, তেমনি এ বছর ২০১৭। তবে এবারে সেটি সবচেয়ে তীব্রমাত্রা পেয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব মতে গত মাত্র ৩ সপ্তাহে ৪ লাখ ২০ হাজারের বেশী মুসিলমকে তারা দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। ইতিমধ্যেই অর্ধেকের চেয়ে বেশী মুসলিম গ্রামকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূলই যে মায়ানমার সরকারের রাষ্ট্রীয় নীতি -সেটি এখন বিশ্ববাসীর কাছেও সুস্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার প্রধান বলেছেন,  রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে যা ঘটছে সেটি বর্ণগত নির্মূলের একটি “টেক্সবুক উদাহরণ”। যাদের আজ বহিষ্কার করা হচ্ছে তাদের নিজেদের জন্ম যেমন আরাকানে, তেমনি শত শত বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে তাদের পূর্ব পুরুষগণ। এরূপ স্থায়ী বাসিন্দাদের নির্মূলকরণের ন্যায় বর্বর কর্মকে জায়েজ করতে ১৯৮২ সালে আইন করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের থেকে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, মুসলিম নির্মূলে মায়ানমার সরকারের এতটা পরিকল্পিত উদ্যোগের কারণ কী? কারণটি বার্মিজ বৌদ্ধদের নিরেট অর্থনৈতীক স্বার্থপরতা। স্বার্থপরতা সব সময়ই জঘন্য হিংস্রতা ও পাপের পথে টানে। মানব ইতিহাসের অতি ভয়ানক বর্বর কর্মগুলো ঘটেছে মূলত জঘন্য স্বার্থপরতার কারণে। নিরেট স্বার্থপরতাই ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের উত্তর আমেরিকার বুক থেকে সেখানকার আদি অধিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইনকা সভ্যতার ধারকদের নির্মূলে প্ররোচিত করেছিল। একই রূপ স্বার্থপরতার কারণে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকেও প্রায় সম্পুর্ণ উচ্ছেদ করা হয়েছে সেখানকার আদিবাসী এ্যাব-অরিজিন ও মাউরীদের। বস্তুত লক্ষ লক্ষ সে বিলুপ্ত মানুষদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতা।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূলের পিছনে কাজ করছে আরাকানের অতিসমৃদ্ধ অর্থনৈতীক ভাণ্ডার। এর সবুজে ঘেরা সমুদ্রতটি প্রায় বাংলাদেশের সমুদ্রতটের সমান। আরাকানের ভূমি যেমন উর্বর, তেমনি এর উপকূলে ২০০৪ সনে সন্ধান মিলেছে তেল ও গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডারের। এতদিন দেশটির স্বৈরাচারি সামরিক সরকারের দখলদারি থাকায় বিদেশী শক্তিবর্গ সেখানে তেল ও গ্যাসের উত্তোলনে উদ্যোগ নেয়নি। এখন নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা যাওয়ায় চীন, ভারত ও জাপানসহ অনেক দেশ এখন সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাতে তেল ও গ্যাসে সমৃদ্ধ এ এলাকায় কাতার-কুয়েতের ন্যায় দ্রুত অর্থনৈতীক উন্নয়নের সম্ভাবনা বেড়েছে। অপরদিকে ভারত চায়, তার পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলোর জন্য একটি বড় আকারের সমুদ্র-বন্দর গড়তে। কিন্ত মুসলিম অধ্যুষিত এ এলাকায় বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে তারা শংকিত। বৌদ্ধ বার্মিজদের ভয়, এলাকাটি একদিন মুসলিমদের হাতে পড়বে। তাই তারা এলাকাকে মুসলিম-শূন্য করার পথ বেছে নিয়েছে। তাতে সম্মতি যে ভারত, চীন ও রাশিয়ারও  রয়েছে সেটি প্রমাণিত হয় দেশগুলোর এ মুহুর্তে মায়ানমার সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়ায়।

তাছাড়া মুসলিম নির্মূলে বার্মিজদের সামনে এখনই যে সবচেয়ে উপযোগী সময় তারও পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে।  কারণ, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এখন চলছে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী তীব্র হাওয়া। মুসলিমদের বিরুদ্ধে নির্মূলে নেমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ভারত। তাছাড়া সে কাজের জন্য আজ উপযোগী হলো মায়ানমারের নিজস্ব রাজনৈতীক পরিস্থিতি। এতদিন মুসলিম নির্মূলের এ বর্বর কর্মটি ঘটছিল স্বৈরাচারি সামরিক শাসকদের একক নেতৃত্বে ও নিষ্ঠুর সৈনিকদের হাতে। এখন দেশটিতে নেত্রীর আসনে  অধিষ্ঠত হয়েছে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অং সাঙ সুকি। মুসলিম নির্মূলের কোয়ালিশনে সামরিক বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে  অং সাঙ সুকির লীগ ফর ডিমোক্রাসি। স্বৈরাচারি সামরিক শাসকদের রোষানলে পড়ে যারা এতদিন দেশছাড়া হয়েছিল বা কারাবাসে ছিল তারাও এখন মুসলিম নির্মূলে সামরিক বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে। সে কোয়ালিশনে রয়েছে উগ্র মুসলিম-বিদ্বেষী বৌদ্ধ পুরোহিত ও তাদের অনুসারিরা। রোহিঙ্গা নির্মূল কর্মটি এভাবে মায়ানমারের বুকে একটি গণভিত্তি পেয়েছে –যেমনটি পেয়েছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের রেড ইন্ডিয়ার নির্মূলের ন্যায়  ইতিহাসের অতি বর্বরতম কর্ম। অং সাঙ সুকি যে কতটা তার সাথে একাত্ম হয়েছে তার প্রমাণ, তিন সপ্তাহ নিশ্চুপ থাকার পর মায়ানমারে সংঘটিত সকল নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের দায়ী করছেন। এবং সামরিক বাহিনীর চলমান নিষ্ঠুরতাকে চিত্রিত করেছেন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান রূপে। যেন মুসলিমদের ঘরে ঘরে গিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ নিজেরা আগুণ দিচ্ছে, গ্রামগুলি নিশ্চিহ্ন করছে এবং নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে!

বৈদেশিক অঙ্গণেও মায়ানমার সরকার পেয়েছে ভারত, চীন ও রাশিয়ার ন্যায় শক্তিবর্গকে। প্রচণ্ড মুসলিম-বিদ্বেষী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মায়ানমার সরকারের নিন্দা করতে অনিচ্ছুক। একই নীতি ভারত, চীন ও রাশিয়ার। মুসলিমদের অধিকার খর্ব করার ক্ষেত্রে এরা সবাই একই নীতির অনুসারি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত তো মুসলিমদের রক্তে রক্তাত্ব। মুসলিম নির্মূলের পথ ধরেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। ভারতের গুজরাত প্রদেশে ২ হাজারের বেশী মুসলিম নারী, শিশু ও পুরুষকে হত্যা করা হয় তার মুখ্যমন্ত্রী থাকার আমলে। আগুণ দেয়া হয় মুসলিমদের ঘরাড়ী ও দোকানপাঠে। মুসলিম নির্মূলের সেটি ছিল আরেক ভয়ংকর রূপ। গুজরাতে মুসলিম নিধন থামাতে তিনি কোন উদ্যোগই নেননি। এমন এক মুসলিম বৈরী চেতনার কারণে পৃথিবীর কোথাও মুসলিম নিধন শুরু হলে তার মনে পুলক শুরু হয়। মনের সে পুলক জাহির করতেই তিনি দ্রুত ছুটে যান মিয়ানমারের রাজধানীতে। এবং সেটি তখন যখন মায়ানমারে মুসলিম নির্মূলের প্রক্রিয়াটি নিষ্ঠুরতার দিক দিয়ে তার সর্বোচ্চ মাত্রায়। মোদী সে নির্মূলকরণকে নিন্দা না করে সমর্থণ করেছেন। বলেছেন, ভারত সরকার মায়ানমারের পাশে থাকবে। একই নীতি চীন ও রাশিয়ার। লক্ষণীয় হলো, মায়ানমার পক্ষ নেয়া এদেশগুলোরও রয়েছে নিজ নিজ আরাকান।  চীন সরকারের নিজস্ব সে আরাকানটি হলো, উইগুর মুসলিম অধ্যুষিত সিংকিয়ান প্রদেশ যা আয়তনে বাংলাদেশের কয়েকগুণ। অপরদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুটিনের নিজস্ব আরাকানের আয়তনটিও বিশাল। চেচনিয়া ও দাগেস্তানের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিকৃত এলাকায় পুটিনের মুসলিম বিরোধী নিষ্ঠুরতা আজ কোন গোপন বিষয় নয়। চেচেন মুসলিমদের স্বাধীনতার যুদ্ধ দমন করতে কামান দেগে গুড়িয়ে দেয়া হয় রাজধানী গ্রোজনীর ন্যায় পুরা শহরকে। সম্প্রতি বিমান হামলা ও মিজাইলের আঘাতে একই ভাবে নিশ্চিহ্ন করেছে সিরিয়ার প্রধান নগরী আলেপ্পোসহ বহু নগরীকে।


মায়ানমার বৃটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা পায় ১৯৪৮ সালে। কিন্তু ১৯৭১ সাল অবধি এ ২২ বছরে মুসলিম নির্মূলের এমন কর্ম হাতে নিতে মায়ানমার সরকার কখনোই সাহস পায়নি। কারণ তখন রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশে ছিল বার্মার চেয়ে শক্তিশালী পাকিস্তান। ১৯৭১য়ে প্রতিবেশী রূপে পাকিস্তানের বিলুপ্তির পর মায়ানমারের সে ভয়ও বিলুপ্ত হয়েছে। প্রতিবেশী রূপে পেয়েছে বাংলাদেশের ন্যায় একটি দুর্বল রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক শক্তিশালী হলো মায়ানমারের সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনীতে রয়েছে ৪ লাখের মত নিয়মিত সৈন্য। রয়েছে শক্তিশালী বিমান বাহিনী। বাংলাদেশ সরকার সম্ভবত সেটি বুঝে। ফলে মায়ানমারের হেলিকপ্টার বার বার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকলেও সরকার সীমান্তে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বাংলাদেশের সামরিক শক্তি ও মর্যাদাবোধ এতটাই তলায় ঠেকেছে যে,  সীমান্ত থেকে বাংলাদেশীদের বার বার ধরে নিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোন ব্যবস্থা নেয় না। বরং সরকার সেনাবাহিনীকে দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে অন্য কাজ। তারা ব্যবহৃত হচ্ছে সরকারের গদি রক্ষার কাজে সহায়তা দিতে নিজ দেশের নিরস্ত্র জনগণ হত্যা ও দমন করায়। যেমনটি ব্যবহৃত হয়েছে ২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের হত্যা করায়। ব্যবহৃত হচ্ছে সেতু নির্মাণ, রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণ এবং রিলিফ বিতরণের কাজে।

নির্লিপ্ত কেন শেখ হাসিনা?

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল থেক বাঁচানোর চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের বড় এজেন্ডা হলো নিজ দেশের বিরোধী দলগুলো নির্মূল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনে নিজের গদি বাঁচানো ছাড়া কোন বড় ভাবনা নাই। গুরুত্বপূর্ণ কোন এজেন্ডাও নাই। তাছাড়া ভারত ভিন্ন শেখ হাসিনার কোন বিদেশী বন্ধুও নাই। বরং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে ভারত সরকারের সর্বপ্রকার সহযোগিতা নিয়ে। তাই ভারত অখুশি হবে এমন কোন পররাষ্ট্র নীতি বা স্বরাষ্ট্র নীতি হাতে নেয়া শেখ হাসিনার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি চলে দিল্লির নির্দেশে। তাই ভারত যেখানে মায়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিপক্ষে যাওয়ার পথ তাই বন্ধ। সম্প্রতি সেটিই প্রমাণিত হলো আরাকান প্রশ্নে মোদির সুস্পষ্ট ঘোষণার পর। মায়ানমারের পক্ষে মোদির ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাগণ কথা বলছে ভারতের সাথে সুর মিলিয়ে। তাই ভারত যেমন আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সন্ত্রাস আবিস্কার করছে, সন্ত্রাসের তেমন একটি অভিযোগ এনে রোহিঙ্গাদের উপর নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশের সরকারও। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তরে হাসিনার নিজের ক্ষমতার ভিত্তিটাও অতি দুর্বল। যে কোন নিরপেক্ষ নির্বাচনে তিনি যে ক্ষমতা হারাবেন সেটি যেমন শেখ হাসিনা বুঝেন, তেমন তার দলের প্রতিটি নেতা-কর্মীও বুঝে। ফলে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে নির্বাচনে ভোট বক্সের উপর পুরা দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোন ভিন্ন পথ নাই। বিগত নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন সাঁজানো এক জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে –যে নির্বাচনে সংসদের ১৫১ আসনে কোনরূপ নির্বাচনই হয়নি। যেসব আসনগুলোত ভোট কেন্দ্র খোলা হয় সেখানে শতকরা ৫ জনও ভোট দিতে যায়নি। কারণঃ যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা নেই, জনগণ ভোটকেন্দ্রে যাবেই বা কেন? এরূপ অনৈতীক ও অবৈধ ভাবে চেপে বসা সরকারের কি নৈতীক বল থাকে? পারে কি কোন কোন বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে? জনসমর্থনহীন হাসিনা  সরকারের পুরা নির্ভরতা মূলত ভারতের উপর। রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল থেকে বাঁচানোর কাজে শেখ হাসিনার ব্যর্থতা তাই এত বিশাল।

তাছাড়া, পৃথিবীর কোন প্রান্তে মুসলিমদের জানমাল বিপন্ন হলে তাদের পাশে দাঁড়নো শেখ হাসিনা ও তার দলের নীতিও নয়। ফলে কাশ্মীরের মুসলিমদের স্বাধীনতা পক্ষে শেখ হাসিনা ও তার দল কোন কথা বলে না। অথচ দেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কোন দেশের জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলেনর পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশ সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাছাড়া যারা ক্ষমতাসীন তাদের নৈতীক অসুস্থ্যটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি সুপরিচিত।  আজ যে নিষ্ঠুরতা রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে হচ্ছে শেখ হাসিনার দলের নেতাকর্মীগণ ১৯৭১য়ে বাংলাদেশে মাটিতে একইরূপ নিষ্ঠুর আচরণ করেছে ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আশা অবাঙালী মুসলিমদের। বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার অধিকার থেকেই শুধু তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়নি, বাংলাদেশে তারা ঘর-বাড়ী, দোকান-পাঠ, কল-কারখানার মালিক হবে -সে অধিকারও দেয়া হয়নি। ঘর-বাড়ী, দোকান-পাঠ, কল-কারখানা ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরকে আকাশের নিচে বসানো হয়েছে এবং বহু হাজারকে হত্যাও করা হয়েছে। বহু অবাঙলী নারীকে ধর্ষণও করা হয়েছে। এসবই একাত্তরের ইতিহাস। এমন এক অপরাধপূর্ণ চেতনা নিয়ে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিবে সেটিই বা কীরূপে আশা যায়? তাই দেখা যায় প্রাণ বাঁচাতে আসা রোহিঙ্গা নর, নারী ও শিশুকে বাংলাদেশের সীমান্তে খোলা আকাশের নীচে দু্ই-তিন ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। এটি অতিশয় নির্দয় হৃদয়হীনতা। অথচ সেটি ১৯৪৭ বা ১৯৪৮য়ে হিন্দুস্তান থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা মুসলিমদের বেলায় ঘটেনি। তাদের জন্য সীমান্ত ২৪ ঘন্টা খোলা রাখা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও তাঁর দল বর্তমানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে কিছু বলা শুরু করলেও সেটি আন্তর্জাতীক চাপে, মনের টানে নয়। শেখ হাসিনার মনের পরিচয় তো তখন পাওয়া যায় যখন বাংলাদেশের সীমান্তে রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বাধা দেয়া হয়।

রেকর্ড বিবেকহীনতার

বাংলাদেশ সরকারের নিষ্ঠুর বিবেকহীনতা বিশ্ববাসীর সামনে ধরা পড়েছে ২০১২ সালেও। তখন  দেখা গেছে, হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে আন্দামান সাগরে মাছ ধরার ট্রলারে ভাসতে। তাদের মাঝে ছিল বহু নারী এবং শিশু। তাদের ট্রলারে খাবার ছিল না। খাওয়ার পানি ছিল না। প্রয়োজনীয় ঔষধও ছিল না। ক্ষুধার্ত পেট, নিস্তেজ দেহ ও মলিন মুখ নিয়ে কেঁদে কেঁদে “আমাদের বাঁচাও বাঁচাও” বলে সাহায্য চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোস্টাল গার্ড তাদের ট্রলারগুলোকে বাংলাদেশের তীরে ভিড়তে দেয়নি। ভিড়তে দেয়নি থাইল্যান্ডর সরকারও। মায়ানমার সরকারেরর মুসলিম উচ্ছেদকরণ যে প্রক্রিয়াটি ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল সেটি ঐ বছরেই থেমে যায়নি। ফলে থেমে যায়নি রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়ার ঝুকিপূর্ণ উদ্যোগ। বাংলাদেশে আশ্রয় না পেয়ে তারা পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে দূরের থাইল্যান্ডের দিকে। সে সময় বিবিসি’র সংবাদদাতা জনাথান হেড সরেজমিনে গিয়ে এক লোমহর্ষক তথ্য দিয়েছিলেন। সেটি ছিল এরূপঃ “থাইল্যান্ড উপকূলের অদূরে আন্দামান সাগরে মাছ ধরার একটি ট্রলারে প্রায় সাড়ে তিনশ রোহিঙ্গা এক সপ্তাহ ধরে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে নিজেদের মূত্র পান করে প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রাম করছে। ওই নৌকায় দশজন মারা যায়। সেটিতে গাদাগাদি করে ছিল ৩৫০ জনের মত নারী,পুরুষ ও শিশু। অনেকগুলো নৌকায় কয়েক হাজার মানুষ দিনের পর দিন সাগরে ভাসছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে এ সংখ্যা আট হাজারের মত হবে। (সূত্রঃ বিবিসি বাংলা, ১৫ই মে,২০১৫)।

জাতিসংঘ ও নানা দেশের নেতাদের চাপে বাংলাদেশ এবার তার সীমান্ত খুলতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সীমান্ত খুললেও বিবেকের দোয়ার কি খুলেছে? পরিবর্তন এসেছে কি তাদের চেতনায়? পরিবর্তন যে আসেনি সেটি বুঝা যায় শেখ হাসিনার নীতি ও কর্মকাণ্ডে। সাড়ে তিন হাজার মাইল দূর থেকে তুরস্কের ফাস্ট লেডি ও সে দেশের বেশ কিছু কর্মকর্তা রিলিফ-সামগ্রী রোহিঙ্গাদের কাছে পৌঁছতে পারলেও সেরূপ দ্রুততার সাথে শেখ হাসিনা সেখানে পৌঁছতে পারেননি। কারণ, সে জন্য তো বিবেকের বল ও ঈমানের তাড়না লাগে। সরকারের ব্যস্ততা, রিলিফ বিতরণের কাজকে কি করে দলীয়করণ করা যায় তা নিয়ে। ফলে অন্যদলের নেতাকর্মী ও নির্দলীয়দের ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজেও সরকার বাধা সৃষ্টি করছে। পত্রিকায় প্রকাশ, সরকার বিএনপির ত্রাণবাহি ২২টি ট্রাককে আটকে দিয়েছে। শেখ হাসিনা চান, দেশ ও বিদেশ থেকে সংগৃহীত রিলিফের সামগ্রী দলীয়করণকৃত প্রশাসন ও দলীয় কর্মীদের হাতে তুলে দিতে -যেমন একাত্তরেরর পর তার পিতা তুলে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের সে নীতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠলেও দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের বহুলক্ষ মানুষের সেদিন মৃত্যু ঘটেছিল। রিলিফের মালামাল তখন কলকাতার বাজারে গিয়ে উঠেছিল। হয়তো এবারেও একই কারণে বিনা খাদ্য ও বিনা ঔষধে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমের মৃত্যু হবে। তাই মায়ানমারেরর গণহত্যা থেকে বাঁচলেও আওয়ামী দুষ্ট শাসনের নিষ্ঠুর বিবেকহীনতা থেকে এ বিপন্ন মানুষদের বাঁচানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

সরকারের বিবেকহীনতার চিত্রটি কোন গোপন বিষয় নয়; সেটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র। সেটি বুঝা যায়, রিলিপ ক্যাম্পগুলোর নিদারুন দুরাবস্থা দেখে। সে চিত্রটি ফুটে উঠছে নানা দেশের টিভির পর্দায়। যে কোন সভ্যদেশে গরুর গোয়ালের অবস্থাও এর চেয়ে ভাল হয়। কিন্তু তা নিয়ে সরকারের মাথা ব্যথা নেই। যেন বাংলাদেশে আশ্রয়কেন্দ্র বানানোর জায়গা নেই, সামগ্রী নেই, অর্থও নাই। বিশ্ববাসীকে সে অসামর্থ্যের কথাই বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে বার বার শুনানো হচ্ছে। যেন বাংলাদেশে নির্মাণ সামগ্রীর আকাল। এখানে অসামর্থ্যতাটি সামগ্রীর নয়, বিবেকের। লেবানন মত একটি ক্ষুদ্র দেশে আশ্রয় পেয়েছে প্রায় ১০ লাখ মোহাজির। তুরস্কের জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। কিন্তু সে দেশটি আশ্রয় দিয়েছে তিরিশ লাখের বেশী সিরিয়ান মোহাজিরকে। তুরস্কে সরকার তাদের জন্য অতিদ্রুত স্বাস্থ্যসম্মত ঘর নির্মাণ করে বসবাসের ব্যবস্থা করেছে। খাদ্য, পানীয় ও টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে। অথচ বিগত তিন সপ্তাহেও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় বাসস্থান নির্মাণ করতে পারিনি। হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুকে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতে হচ্ছে পানি ও কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে। তাদের জন্য সামান্য নিদ্রা বা বিশ্রামের কোন জায়গা নেই। শিশুরা ঘুমাতে বাধ্য হচ্ছে তাদের পিতার কাঁধে ও কোলে। এ অসহায় মানুষগুলো যে অন্য কোথাও গিয়ে শুকনো জায়গায় আশ্রয় নিবে তার উপরও সরকার বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। যেন সমগ্র বাংলাদেশ একমাত্র বাঙালীর। আল-জাজিরার সংবাদদাতা খবর দিয়েছেন, ত্রাণ কাজে বাংলাদেশর সরকারের কোন উদ্যোগ নজরে পড়ে না। যারা সেখানে কাজ করছে তারা বেসরকারি লোক ও প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তানে তিরিশ বছরের বেশী কাল ধরে বসবাস করছে তিরিশ লাখের বেশী আফগান। অথচ ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে ৪ লাখ রোহিঙ্গা মোহাজির নিয়েই সরকার পক্ষ থেকে এমন ভাব দেখানো হচ্ছে যেন বাংলাদেশের সকল সামর্থ্য নিঃশেষ। সমস্যা এখানে সামর্থ্যের নয়, বরং মানবিক গুণের। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে যে সংস্কৃতিটি প্রবলতর হয়েছে সেটি দেয়ার নয়, বরং হাত পেয়ে নেয়ার ও নানা ফন্দিতে দু’হাতে গ্রাসের।  শেখ হাসিনা সরকারের তেমন একটি অসুস্থ্য চেতনা ও সংস্কৃতি এবং নিদারুন অযোগ্যতাটি বিশ্ববাসী আজ টিভির পর্দায় দেখছে, যেমন ২০১২ সালে দেখেছে দুর্গতগ্রস্তদের নৌকাকে তীর থেকে তাড়িয়ে দেয়ার মাঝে।

সরকারের প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দূর্নীতিতে আক্রান্ত। ফলে, যারা ত্রাণ দিতে প্রচণ্ড আগ্রহী তারাও সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ফলে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ নিজহাতে ত্রাণ নিয়ে হাজির হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই গরীব। তাদের আর্থিক সামর্থ্যও অতি সামান্য। ফলে রোহিঙ্গা মুহাজিরদের জন্য এ এক করুন অবস্থা। এরূপ অবস্থায় কেই অনাহারে এবং কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে -সেটিই স্বাভাবিক। তাদের চলাফেরার উপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় দেশের অন্যত্র গিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে সে সুযোগও তাদের নেই। তাদের জন্য বাংলাদেশ যেন আরেক জেলখানা। মহান নবীজী (সাঃ) বিশ্বমুসলিমকে এক দেহ ও এক উম্মাহ বলেছেন। উম্মাহর এক অঙ্গে ব্যাথা হলে সমগ্র দেহে সে ব্যাথা অনুভুত হবে,অন্য অঙ্গগুলিও সে ব্যাথা রোধে এগিয়ে আসবে -সেটাই তো কাঙ্খিত। কিন্তু কোথায় সে ব্যাথার অনুভুতি? কোথায় উপশমের চেষ্টা? উম্মাহ যে বেঁচে আছে তারই বা প্রমাণ কৈ? প্রাণ থাকলে এ নৃশংস নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কি সমগ্র উম্মাহ গর্জে উঠতো না?

ঈমানদারের দায়ভার

ইহুদী,খৃষ্টান বা হিন্দুদের সাথে বিশ্বের কোথাও এরূপ বর্বরতা ঘটলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ত্বরিৎ বৈঠক বসতো এবং মায়ানমারের ফাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষিত হতো। দেশটির বিরুদ্ধে নানারূপ নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হত।  প্রতিবেশী হিসাবে মায়ানমার সরকারের নৃশংস নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের জনগণের। কিন্তু সরকার প্রথম দুই সপ্তাহ নিশ্চুপ থেকেছে। বরং শেখ হাসিনা তাঁর খাদ্য মন্ত্রীকে মায়ানমারে চাউল ক্রয়ে পাঠিয়েছেন। এবং রোহিঙ্গাদের দমনে মায়ানমার সরকারের সাথে তার সরকার সহযোগিতা করবে সে কথাও বলেছেন। অপরদিকে অন্যরা প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে মাঠে নামুক সেটি তিনি হতে দিচ্ছেন না। ফলে মায়ানমারের বর্বরতার বিরুদ্ধে ক্রোধে সূদুর চেচনিয়ায় লক্ষাধিক মানুষের মিছিল হলেও সেরূপ মিছিল ঢাকায় বা চট্টগ্রামে হয়নি। মায়ানমারের দূতাবাসের সামনে মিছিল লন্ডন, প্যারিস, ইসলামাবাদসহ বিশ্বের বহু শহরে হলেও ঢাকায় হয়নি। অথচ জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ইসলামে ফরজ। কি বিস্ময়! সে ফরজ পালনেও সরকারের পক্ষ থেকে বিধি নিষেধ।

 

কোন ব্যক্তি যে বেঁচে আছে সেটি বুঝা যায় তার শরীরের নড়াচড়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের মাঝে। তেমনি ব্যক্তির মাঝে তার ঈমান ও সুস্থ্য বিবেকবোধ যে বেঁচে আচে সেটি বুঝা যায় জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। মৃত ব্যক্তির সে সামর্থ্য থাকে না। দাঁড়ানো দূরে থাক, মুখে প্রতিবাদ বা অন্তরে ঘৃনা করার সামর্থ্যও থাকে না। বেঈমান দুর্বৃত্তেরও  থাকে না। প্রায় শত বছর আগে প্রখ্যাত ভারতীয় আলেম মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন,“বলকানের রণাঙ্গনে কোন তুর্কি সৈনিক যদি গুলিবিদ্ধ হয় বা আফ্রিকার জঙ্গলে কোন মুসলিমের পা যদি কাঁটা বিদ্ধ হয়,আর সে ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না করো -তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও।” -(সূত্রঃ আবুল কালাম আযাদ রচনাবলি,প্রকাশনায় ইসলামি ফাউন্ডশেন,ঢাকা)। অথচ রোহিঙ্গা মুসলিমের সংকট তো তার চেয়েও গুরুতর ও ভয়াবহ। তাদের সংকটটি কোন সৈনিকের গুলিবিদ্ধ বা কাটাবিদ্ধ হওয়ার নয়,সেটি তো একটি জনগোষ্ঠির নৃশংস নির্মূলের। সেটি মুসলিম নারীর ধর্ষণ ও হত্যার। এরূপ অসহায় মজলুমদের পক্ষ না নিলে বিচার দিনে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে যে দারুন অপরাধি হতে হবে এবং সে অপরাধে শাস্তি পেতে হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? এমন হৃদয়শূণ্য ও দায়িত্বশূণ্য ব্যক্তিটি নবীজী (সাঃ)র সামনেই বা তাঁর উম্মত রূপে মুখ দেখাবে কি করে? ঈমান কি ব্যক্তিকে কখনো উদ্ভিদের ন্যায় এরূপ নির্জীব ও নিস্তেজ করে? ঈমান কি কখনো এরূপ বিবেকহীন, হৃদয়হীন, দায়িত্বহীন ও অনুভুতিহীন মানুষের মাঝে বাঁচে?

 

যে ব্যর্থতা বাঙালী মুসলিমের

রোহিঙ্গাগণ যেমন মুসলিম,তেমনি তাদের নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কও বাঙালী মুসলিমদের সাথে। বাংলাদেশই তাদের নিকটতম প্রতিবেশী; ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড নয়। যে ভাষায় তারা কথা বলে সে ভাষাটিও চট্রগ্রামের আঞ্চলিক বাংলার কাছাকাছি। এককালে শুধু সমগ্র চট্টগ্রাম জেলাই শুধু নয়, নোয়াখালীর ফেনী পর্যন্ত ছিল অখণ্ড আরাকান রাজ্যের অংশ। তখন এক অভিন্ন রাষ্ট্রে রোহিঙ্গাদের সাথে ছিল চট্টগ্রামবাসির বসবাস। কবি আলাউল, দৌলত কাজী, কোরেশী মাগন ঠাকুর, নসরুল্লাহ খান ছিলেন আরাকান রাজ-সভার প্রখ্যাত কবি। ষষ্ঠদশ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষা পরিচর্যা পেয়েছিল এসব কবিদের হাতে। অতএব রোহিঙ্গাদের বিপদকালে যে দেশটির সর্বপ্রথম এগিযে আসা উচিত ছিল সেটি বাংলাদেশ। বাঙালী জাতীয়তা নিয়ে যাদের গর্ব,তাদের বিবেকেও রোহিঙ্গাদের এ দুর্যোগে সহানুভূতি জাগা উচিত ছিল। কিন্তু সেটি ঘটেনি। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দেয়া কি বাংলাদেশের সামর্থ্যের বাইরে? বাংলাদেশের জনসংখ্যা যখন আজকের তুলনায় সিকি ভাগ ছিল তখনো তো দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এসেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখনও অনাহারে মারা গেছে। রিজিক আসে মহান করুণাময় আল্লাহতায়ালা থেকে। ফলে দেশে জনসংখ্যা বাড়লে সেদেশে মহা শক্তিমান রিজিকদাতার পক্ষ থেকে খাদ্য ও সম্পদের জোগানও বেড়ে যায়। তাছাড়া মোহাজিরগণ তো মহান আল্লাহতায়ালার মেহমান। ফলে তাদের আগমনে দেশে রহমতও আসে। এটিই তো ইসলামের মৌল বিশ্বাস। সে সামান্য ঈমানটুকু হাসিনার থাকলে কি সে প্রাণ বাঁচাতে আসা মজলুম রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে শেখ হাসিনার সরকার গড়িমসি করতো। ২০১২ সালে বাঙালী জাতীয়তাবাদি হাসিনা সরকার প্রাণ বাঁচাতে আশা আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের নৌকাগুলোকে তীরে নোঙর না করতে আবার সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক দুর্যোগের শুরুতেও তাদের আশ্রয় দিতে গড়িমসি করেছে। বাংলাদেশীদের জন্য এটি এক ভয়ানক নৈতীক ও ঈমানী ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কালিমা বাংলাদেশের জনগণকে আগামী বহুশত বছর ধরে বহন করতে হবে। শেখ হাসিনা সরকারের এ নৃশংসতা এক কালে বাংলাদেশের পাঠ্য পুস্তকেও স্থান পাবে। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেয়া আগামীদিনের ঈমানদারগণ তখন প্রশ্ন তুলবে, “আমাদের পূর্বপুরুষগণ কি এতই বিবেকহীন ছিল?” এ অপরাধে আখেরাতেও আসামীর কাটগড়ায় তাঁকে দাঁড়াতে হবে।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিপদের মধ্য দিয়ে ঈমানের পরীক্ষা হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিমদের। ঘরে আগুণ লাগলে প্রতিবেশীর আসল চরিত্রটি প্রকাশ পায়। দুর্যোগের সে মুহুর্তে গরু-ছাগলদের ঘাস খাওয়ায় ছেদ পড়ে না। কারণ তারা পশু ও বিবেকহীন। অনুরূপ চিত্রটি দেখা যায় পশু চরিত্রের প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রেও। মানবরূপী সে পশুগণ আগুণ থামাতে না নেমে দূরে দাঁড়িয়ে ঘরবাড়ি পোড়ার দৃশ্য দেখে। সে বিপদের মুহুর্তেও অনেকে চুরির ফন্দি আঁটে। কিছু করার বদলে রোহিঙ্গাদের নিয়েও অনেকে সে পথে নেমেছে। মহাজ্ঞানী রাব্বুল আ’লামীনের কাছে এরূপ বিবেকশূণ্য ও ঈমানশূণ্য ব্যক্তিবর্গ শুধু গবাদী পশুতুল্যই নয়, তার চেয়েও নিকৃষ্ট। এরূপ ঈমানশূণ্যদের বর্ণনা দিতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “উলাইয়ীকা কা’আল আনয়াম,বাল হুম আদাল” অর্থ: তারাই হলো গবাদী পশুর ন্যায় বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। অন্যায় রুখতে নবীজী (সাঃ)বাহুবল প্রয়োগের কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে বিশাল। দেশের ১৬ কোটি মুসলিমের মাঝে ক’জনের আছে সে বাহুবল? সেটি থাকলে তো জুলুমের বিরুদ্ধে আরাকানে লাগাতর জিহাদ শুরু হত। সেটি সম্ভব না হলে জবান দিয়ে রুখতে বলেছেন। ১৬ কোটি মুসলমানের মাঝে ক’জনের আছে সে জবানের বল? সেটি থাকলে তো দেশব্যাপী গগনবিদারি আওয়াজ উঠতো। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোথায় সে প্রতিবাদ মিছিল? আওয়াজ তোলা অসম্ভব হলে নবীজী (সাঃ) দুর্বৃত্তদের হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করতে বলেছেন। কিন্ত ঘৃণার সামর্থই বা ১৬ কোটি মুসলমানের মাঝে ক’জনের? সে সামর্থ্য থাকলে কি দেশে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তগণ কোন একটি নির্বাচনেও বিজয়ী হত? মাছের পচন যেমন মাথায় শুরু হয়, তেমনি বাংলাদেশেও নৈতিকতার সবচেয়ে বড় পচনটি তাদের যারা দেশের শাসন ক্ষমতায়।

বাংলাদেশী মুসলিমের দায়িত্ব

ঘরে আগুন লাগলে প্রথম দায়িত্ব হয়, সে আগুন থেকে প্রতিটি নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাঁচানো। তেমনি এ মুহুর্তে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের মূল দায়িত্বটি হলো সর্ব সামর্থ্য দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়া। এবং তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও স্বাস্থ্য সেবা দেয়া। তবে স্রেফ খাদ্য, বস্ত্র ও স্বাস্থ্য সেবার মধ্য দিয়েই  রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমস্যার সমাধান হবে না। যারা হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নি সংযোগের মত কাজ করতে দ্বিধা করে না তাদের ন্যায় পাপীষ্টদের উপর কোন মানবিক রীতি-নীতি ও নসিহত কাজ দেয় না। রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে আগুণ দেয়া এ দুর্বৃত্তগণ এখনও বন্ধ করেনি। এমন বর্বরতার মুখে বিশ্বের অন্যরা যেহেতু পড়েনি তারা এর দ্রুত সমাধান নিয়ে আগ্রহ দেখাবে -সেটি আশা করাও বেওকুপি। এ সমস্যার সমাধানের মূল দায়িত্বটি রোহিঙ্গা মুসলিম ও  বাংলাদেশী মুসলিমদের। এবং সমাধান খুঁজতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া বিধান পবিত্র কোরআন থেকে।  শত্রুর পক্ষ থেকে আরোপিত এমন বিপদের মোকাবেলায় মহান আল্লাহতায়ালা হিজরত ও জিহাদ ফরজ করেছেন। তাই শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও দোয়া-দরুদের মধ্যে ইবাদত সীমিত রেখে মু’মিনের দায়িত্ব পালন হয় না। সেটি করলে দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি থেকে অতীতে পবিত্র মক্কা নগরীকে কখনোই মুক্ত করা যেত না। মহান আল্লাহতায়ালার বিধান, ঈমানদারদের দিয়ে তিনি জালেমদের শিকড় নির্মূল করেন। তাই মু’মিনের দায়িত্ব হলো সে কোরআনী প্রজেক্টের সাথে একাত্ম হওয়া।

জিহাদের বিকল্প শুধু জিহাদই। জালেমের সাথে হাত বা গলা মেলানো হয়। জিহাদ হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কোরআনী বিধান। জান্নাতে উঠার এটিই একমাত্র সরাসরি সিঁড়ি। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতও। মহান আল্লাহতায়ালা আর কাউকেই কখনো নবী-রাসূল করবেন না। তবে নিজের প্রিয় বান্দাদের বেছে নেয়ার কাজটি বন্ধ করেননি। তিনি তাদের বেছে নেন জিহাদের ময়দান থেকে। যারা কবরের আযাব, আলমে বারযাখের অপেক্ষা, রোজ হাশরের মুছিবত, ফুল সিরাতের পরীক্ষা এড়িয়ে সাথে সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে চায় তাদের জন্য সে নিশ্চিত পথটি হলো জিহাদের। সে সুযোগটি দিতেই মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের দেশে জিহাদের ময়দানও খুলেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে মহান আল্লাহতায়ালা সে সুযোগটি সবচেয়ে বেশী দিয়েছেন নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের। সে সুযোগ নিতে  সাহাবীদের শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন। মুসলিম ইতিহাস সকল বিজয় ও গৌরব তো এই শহীদদের। সে অভিন্ন পথটিই ধরেছিলেন আফগানিস্তানের মুজাহিদগণ। তাই তারা সোভিয়েত রাশিয়ার ন্যায় একটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। প্রশ্ন হলো, ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ কি আড়াই কোটি মানুষের আফগানিস্তান থেকে দুর্বল? এবং মায়ানমার কি সোভিয়েত রাশিয়ার চেয়ে শক্তশালী?

 

যে নির্দেশনাটি পবিত্র কোরআনের

প্রতিবেশী রূপে বাংলাদেশীদের দায়িত্বটি বিশাল। সে দায়িত্বটি হলো, রোহিঙ্গাদের সংকটকে স্রেফ রাজনীতি, কুটনীতি বা রিলিফ কর্মের মধ্যে সীমিত না রেখে শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদে পরিণত করা। একমাত্র তখনই মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ  থেকে ফেরেশতাগণ তাদের পাশে নেমে আসবেন। নইলে তাদের উপর শয়তানের ষড়যন্ত্র ও দখলদারি বাড়বে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার মূলত প্রতিনিধিত্ব করে সে শয়তানী শক্তির। তারা ইসলামের স্বঘোষিত শত্রুপক্ষ। তারা যেমন শরিয়তী বিধানের শত্রু, তেমনি শত্রু জিহাদের। যেন জিহাদ মুসলিম জীবনের কোন বিধানই নয়। ফলে মুসলিমের কল্যাণ-কর্মের সামর্থ্য তাদের নেই। বরং তাদের নিজেদের হাত মুসলিমদের রক্তে রক্তাত্ব। তারা তো মায়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস বর্বরতাকেও সন্ত্রাস বলতে রাজী নয়। বরং তারা সন্ত্রাস বলে সেসব মুজাহিদদের যারা সে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মোকাবেলায় খাড়া হয়। তারা তো আরাকানের মুজাহিদদের মোকাবেলায় মায়ানমার সেনবাহিনীর সহয়তা দেয়ার ঘোষনাও দিয়েছে। এরূপ হামলার মুখে ঈমানদারের দায়িত্ব শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়, বরং মজলুম মানুষের খেদমতে লেগে যাওয়া। এক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের নির্দশনাপূর্ণ স্পষ্ট ঘোষণাটি হলোঃ “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী এবং শিশুদের জন্য, যারা বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ থেকে আমাদের নিস্কৃতি দান করুন যার অধিবাসীগণ যালিম। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৭৫।)

তাই এ মুহুর্তে কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি রোহিঙ্গা মুসলিমদের আর্তনাদ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে? সেটি হবে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে চরম অবাধ্যতা। সে অবাধ্যতা শুধু জাহান্নাম প্রাপ্তিকেই অনিবার্য করে। জালেমের জুলুমের মুখে নীরব ও নিরপেক্ষ থাকার অর্থ হলো জালেমের জুলুমের পক্ষ নেয়া। এতে জালেমের জুলুম আরো বর্বর ও নৃশংস হয়। চীন, রাশিয়া বা ভারতের ন্যায় দেশ তো সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে মায়ানমারের পক্ষে। তাই কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি তাদের মুখে দিকে তাকিয়ে সময় ক্ষেপন করতে পারে? সেটি তো সুস্পষ্ট বেওকুপি। তারা তো দৃষ্টি দিবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের দিকে। এবং সে হুকুম পালনে দ্রুত ময়দানে নামবে। সেরূপ হুকুমই ঘোষিত হয়েছে পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত আয়াতে। বিশ্বরাজনীতির কর্ণধারগণ তো বিগত ৭০ বছরেও ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়া ও উইগুর মুসলিমদের সমস্যা সমাধান করতে পারিনি। রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমস্যার বয়সও কম নয়; সেটি চলছে বিগত ৪০ বছর ধরে। এ অবধি তারা বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেয়নি সে সমস্যার সমাধানে। তাই তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোন কালেই ঘরে ফেরা হবে না। এবং বিন্দুমাত্র লাঘব হবে না তাদের দুর্ভোগের। ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তুদের ন্যায় দশকের পর দশক তাদেরও বস্তিতেই কাটাতে হবে। ইসলামের শত্রুগণ মুসলিমদের জন্য তো সেটিই চায়।

বাংলাদেশের ভূমিতে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ এখন মুহাজির। আর তাদের জন্য বাংলাদেশের জনগণ হলো আনসার তথা সাহায্য দানকারী। মদিনার আনসারগণ যেরূপ মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের আশ্রয় দিয়েছিলেন -সেটিই হলো বাংলাদেশের মুসলিমদের সামনে অনুকরণীয় আদর্শ। তারা তাদেরকে ভাই রূপে গ্রহণ করেছিলেন। নিজের দুইখানা ঘর থাকলে একখানা মুহাজির ভাইকে দান করেছিলেন। নিজের বসত ভিটাটিও ভাগ করে নিয়েছিলেন। ব্যবসা শুরু করার কাজে নিজের সে মোহাজির ভাইকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। একাত্তরে ঈমানশূণ্য বাকশালী লুটেরাগণ যেরূপ ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা বিহারীদের ঘর-বাড়ী ও দোকান-পাঠ কেড়ে নিয়েছিল এবং আজও রোহিঙ্গাদের  বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা দেয় -সেটি কোন ঈমানদারের নীতি হতে পারে না। সেটি কোন মনুষ্য নীতিও নয়।

একমাত্র পথ

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়ার পর সমগ্র মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো, মায়ানমার সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা যাতে তাদের জন্য আরাকানে নিজ ভিটায় নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এনিয়ে বাংলাদেশের সরকারকে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় হতে হবে অন্যান্য মুসলিম দেশকে সাথে নিয়ে। মায়ানমার সরকার তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়ায় অস্বীকৃতি জানালে বুঝতে হবে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বন্ধ। তবে বাস্তবতা হলো, মায়ানমার সরকার সেরূপ সমাধানের প্রতি অসম্মতির কথা বহু দশক আগেই জানিয়ে দিয়েছে। মায়ানমার সরকার বিগত ৫০ বছর যাবত প্রমাণ করেছে, মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য নিরাপদ কোন আশ্রয়স্থল নেই্। যা আছে তা হলো হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নিশ্চিহ্নকরণ। ফলে বিকল্প পথ ছাড়া কোন পথও নেই। বিকল্প সে পথটি হলো, কোসোভোর ন্যায় স্বাধীন আরাকানের প্রতিষ্ঠা অথবা বাংলাদেশের সাথে তার অন্তর্ভূক্তি। আরাকানের আয়তন সিঙ্গাপুর, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মাল্টা, লুক্সেমবার্গ, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়ার ন্যায় পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রের চেয়ে বৃহত্তর। রয়েছে উর্বর ভূমি এবং তেল-গ্যাসের ভাণ্ডার। তবে তারা কোনটি চায় তা নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের মাঝে গণভোট হতে হবে। রোহিঙ্গ মুসলিমদের সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের এছাড়া ভিন্ন পথ নেই। সেটি সম্ভব না হলে অনিবার্য রূপ নিবে জিহাদ।

অধিকৃত ভূমিতে মুসলিমের জান বাঁচানোই যেখানে অসম্ভব, সেখানে শান্তিতে বসবাস ও ইসলাম পালন কীরূপে সম্ভব? অতএব সে অধিকৃতি থেকে মুক্তির লড়াইয়ের চেয়ে পবিত্রতম জিহাদই বা আর কী হতে পারে? তাই রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয়দান, খাদ্যদান বা বস্ত্রদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুসলিমদের দায়িত্ব শেষ হবার নয়। এ সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে পবিত্র কোরআন থেকে। শিক্ষা নিতে হবে ইতিহাস থেকে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, অতীতে ইসলামের কোন অধিকৃত ভূমিই স্রেফ দোয়া-দরুদ বা কাকুতি-মিনতির জোর মুক্ত হয়নি। প্রতিটি অধিকৃত ভূমিতেই মুসলিমদের জিহাদে নামতে হয়েছে এবং রক্তের মূল্যে সে ভূমি আজাদ করতে হয়েছে। কথা হলো, আরাকানেও কি ভিন্ন পথ আছে? বাংলাদেশ সরকারের কয়েক দশকের কাকুতি-মিনতি কি মায়ানমারের শাসকদের মনে আদৌ কোন প্রভাব ফেলেছে? কয়েক দশক ধরে আলাপ-আলোচনা করেও ফিলিস্তিনীদের দুঃখ সামান্যতম লাঘব হয়নি। বরং অধিকৃত ভূমিতে বেড়ে চলেছে ইহুদীর সেটেলমেন্ট ও অধিকৃতি। তেমনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের শান্তিপূর্ণ নীতিতে আরাকানে তাদের নিরাপত্তা বা শান্তি বাড়েনি; বরং বেড়েছে নিহত, ধর্ষিতা ও বহিস্কৃতদের সংখ্যা। এরূপ অবস্থায় মুসলিমদের উপর মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলোঃ “এবং তোমরা প্রস্তুত করো তাদের (শত্রুর) বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিজেদের যথাসাধ্য শক্তি; এবং প্রস্তুত করো নিজেদের অশ্ব-বাহিনী; এভাবে সন্ত্রস্ত করো আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের নিজেদের শত্রুদের।” -(সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)। তাই জালেমের হামলার মুখে জিহাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি না নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাটি ইসলামের রীতি নয়। এটি নিরেট প্রচণ্ড কাপুরুষতা। সে সাথে ঈমানশূন্যতাও। এরূপ নাজুক মুহুর্তে জিহাদ এড়িয়ে যাওয়ার অর্থঃ মহান আল্লাহতায়ালার উপরুক্ত ঘোষণার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। এরূপ বিশ্বাসঘাতকতা অতীতে ইহুদীদের জীবনে মহাবিপদ ডেকে এনেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত, নির্যাতীত ও গণহত্যার মুখে পড়তে হয়েছে। পৃথিবীর নানা জনপদে তাদেরকে ভবঘুরের বেশে ঘুরতে হয়েছে। একই কারণে ভয়ানক বিপদ এসেছে মুসলিমদের জীবনে। স্পেন থেকে মুসলিমের নির্মূলের মূল কারণ তো নিজেদর মাঝে অনৈক্য ও জিহাদের প্রস্তুতি না থাকাটি। মুজাহিদ হওয়ার পরিবর্তে তারা সেদিন জিহাদ-বিমুখ সুফি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। মুসলিমগণ আজও সে একই পথ ধরেছে।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের সামনে এখন দু’টি পথ। একটি বার্মিজদের হাতে নিহত, ধর্ষিতা ও নির্মূলের পথ। অপরটি হলো জিহাদ, শাহাদত, বিজয় ও মহান আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছার পথ। মহান আল্লাহতায়ালার পথে শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদ শুরু হলে সেখান বৃদ্ধি পায় বিজয়ের সম্ভাবনা। আরাকানে সেটি শুরু হলে জান্নাতে উঠার সে নিশ্চিত সিঁড়িটি ধরতে অতীতে যেমন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আফগানিস্তানে মুজাহিদদের ঢল নেমেছিল তেমন একটি ঢল যে আরাকানেও শুরু হবে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ জান্নাতের সন্ধানীগণ তো এমন ক্ষেত্রের সন্ধানে বেপরোয়া। তাদের সাহায্যে তখন নেমে আসে ফেরেশতাগণও। তেমনটি হলে তাতে ইসলামের পক্ষের শক্তি প্রচণ্ড শক্তি পাবে বাংলাদেশেও। মুসলিমগণ অতীতে ইসলামের মূল শিক্ষাটি পেয়েছে জিহাদের ময়দান থেকে। এটিই প্রকৃত ইসলাম শেখার মূল মাদ্রাসা। ছিদ্দীক ও শহীদদের ন্যায় মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ গড়ে উঠেছেন জিহাদের এ মাদ্রসা থেকেই। মুসলিমগণ তো তখনই বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যখন মুসলিম বিশ্বজুড়ে এরূপ মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল অসংখ্য। বিশ্বব্যাপী ইসলামের জাগরণ নিয়ে কাফের ও মুনাফিকদের মাঝে আজ যে প্রচণ্ড আতংক, তার মূলে তো আফগানিস্তানের জিহাদ। বাংলাদেশের মাটিতে তেমন একটি মাদ্রাসার বহুশত বছরের যে শূণ্যতা ছিল তা দূর হলে মুসলিমদের ইসলাম পালনে গুণগত পরিবর্তন আসবে শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও। বিষয়টি ইসলামের শত্রু পক্ষ বুঝে। ফলে তাদের এজেন্ডা মায়ানমারের দুর্বৃত্ত সরকারকে দমন করা নয়, বরং আরাকানের মুসলিম ভূমিতে যাতে জিহাদের মাদ্রাসা গড়ে না উঠে -সেটি নিশ্চিত করা। ভারতের ন্যায় বাংলাদেশের সরকারও ইতিমধ্যেই সে বিষয়ে মায়ানমারের দুর্বৃত্ত সরকারের পাশে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা দিয়েছে। তেমন একটি  স্ট্রাটেজী নিয়ে বিশ্বের সকল ইসলাম বিরোধী শক্তি সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ, মিশরের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবুল ফাতাহ আল-সিসি ও সৌদি আরবের রাজার ন্যায় স্বৈরাচারি শাসকদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

মুসলিমদের সাহায্যকারি একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কেউ নাই। অন্য কোন সাহায্যকারি ইসলামের গৌরব যুগেও ছিল না। তবে মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকলে অন্যদের সাহায্যের প্রয়োজনটাই বা কি? পবিত্র কোর’আনের ঘোষণাঃ “ এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে সাহায্য আসতে পারে  না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাশক্তির অধিকারি ও হিকমত ওয়ালা।” -(সুরা আনফাল, আয়াত ১০)।  তাই মুসলিম জীবনের মূল সাধনাটি হওয়া উচিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্য পাওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য রূপে গড়ে তোলা। একমাত্র এ পথেই মুসলিমের জীবনে জিহাদ আসে এবং পরকালে জান্নাতপ্রাপ্তি ঘটে। মহান নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের জীবনের সেটিই মূল শিক্ষা। কিন্তু এখানেই আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্য পাওয়ার শর্ত পূরণ নিয়ে তাদের ভাবনা নাই; বরং সমগ্র ব্যস্ততা কীরূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারতের সাহায্য পাওয়া যায় তা নিয়ে। সেসব শক্তি থেকে সাহায্য লাভের লক্ষ্যে তাদের আরোপিত শর্ত পালনেও তারা ষোল আনা রাজী। তাই তাদের খুশি করতে এমন কি বহু ইসলামপন্থিদের মুখ থেকেও বিদায় নিয়েছে শরিয়ত, জিহাদ, হুদুদ, খেলাফতের ন্যায় ইসলামের অতি মৌলিক শব্দমালা। অথচ অন্য কোন দেশের সাহায্য ছাড়াই প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ রোমান ও পারসিকদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিলেন। অথচ সে সময় তাদের সংখ্যা আজকের রোহিঙ্গা মুসলিমদের চেয়ে বেশী ছিল না। ২৩/০৯/১৭



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Saturday, 23 September 2017 21:04
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.